কলকাতা

হাসপাতালের ডিউটি ফাঁকি দেওয়া আর চলবে না, সরকারি চিকিৎসকদের কড়া নির্দেশ স্বাস্থ্য ভবনের

সোমবার রাতে সল্টলেকের স্বাস্থ্য ভবনে কলকাতার পাঁচ শীর্ষ সরকারি হাসপাতালের শীর্ষ আধিকারিকদের নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

Truth of Bengal: পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এবার রাজ্যের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত এবং গতিশীল করতে নজিরবিহীন কড়া পদক্ষেপ করল শুভেন্দু অধিকারীর নতুন সরকার। সোমবার রাতে সল্টলেকের স্বাস্থ্য ভবনে কলকাতার পাঁচ শীর্ষ সরকারি হাসপাতালের শীর্ষ আধিকারিকদের নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ, নীলরতন সরকার (NRS) মেডিক্যাল কলেজ, এসএসকেএম (SSKM), কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও সুপারদের উপস্থিতিতে হওয়া এই ম্যারাথন বৈঠকে সরকারি চিকিৎসকদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, রেফার রোগ এবং হাসপাতালে দালালরাজ খতম করতে পাঁচটি যুগান্তকারী গাইডলাইন চূড়ান্ত করেছেন স্বাস্থ্য ভবনের উচ্চপদস্থ কর্তারা।

বিগত সরকারের আমলে প্রায়শই অভিযোগ উঠত যে, রোস্টার অনুযায়ী ডিউটি থাকা সত্ত্বেও বহু নামী চিকিৎসক বা সিনিয়র রেসিডেন্ট হাসপাতালে গরহাজির থাকতেন। প্রাইভেট প্র্যাকটিস বা ফাঁকিবাজির এই চেনা ছবি চিরতরে বন্ধ করতে এবার কঠোর নিয়ম চালু করছে স্বাস্থ্য দফতর। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতি মাসের ২৫ তারিখের মধ্যে আগামী এক মাসের জন্য কোন হাসপাতালে, কোন বিভাগে, কখন কোন চিকিৎসক ডিউটি করবেন— তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ‘ডিউটি রোস্টার’ আগেভাগেই স্বাস্থ্য ভবনে পাঠিয়ে দিতে হবে। রোস্টার অনুযায়ী সারপ্রাইজ ভিজিটের সময় যদি কোনো চিকিৎসককে হাসপাতালে অনুপস্থিত পাওয়া যায়, তবে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় স্তরে কঠোরতম আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চিকিৎসকদের পাশাপাশি নার্স, টেকনিশিয়ান এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের হাজিরা নিয়েও কড়া মনোভাব নিয়েছে নবান্ন। অতীতে রোগীর পরিবারকে নিজেরাই ট্রলি ঠেলতে হচ্ছে বা ওয়ার্ডে কোনো কর্মী নেই— এমন দৃশ্য নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই হাজিরার কারচুপি ও ফাঁকিবাজি রুখতে কলকাতার এই পাঁচ সরকারি মেডিক্যাল কলেজের সমস্ত স্তরের কর্মী, নার্স ও চিকিৎসকদের জন্য ‘বায়োমেট্রিক অ্যাটেনড্যান্স’ বা আঙুলের ছাপ দিয়ে হাজিরা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া, জরুরি বিভাগে এসে রোগীরা যাতে কোনো দালালের খপ্পরে না পড়েন বা হয়রানির শিকার না হন, তার জন্য প্রতিটি হাসপাতালের এমার্জেন্সি বিভাগে ২৪ ঘণ্টার হাই-রেজোলিউশন নজরদারি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। এই ক্যামেরাগুলির ওপর সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, সিসিটিভি-র সরাসরি লাইভ ফিড বা মনিটরিং করা হবে সরাসরি স্বাস্থ্য ভবনের সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম থেকে।

জরুরি বিভাগের চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও আনা হয়েছে আমূল পরিবর্তন। এতদিন এমার্জেন্সিতে সাধারণত একজন সাধারণ মেডিক্যাল অফিসার ও জুনিয়র রেসিডেন্ট থাকতেন। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতিটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টাই একজন অতিরিক্ত ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর’ পদমর্যাদার সিনিয়র চিকিৎসক এবং একজন সহযোগী চিকিৎসক উপস্থিত থাকবেন। তাঁরা টানা ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করার পরদিন নিয়মমাফিক ছুটি পাবেন। পাশাপাশি, সরকারি হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য মৃতদেহের পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার যে চেনা কমপ্লেন বা দালাল চক্র সক্রিয় ছিল, তার বিরুদ্ধেও কঠোর জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এবার থেকে মর্গে টাকা লেনদেনের সামান্যতম অভিযোগ এলেই সরাসরি বরখাস্তের মতো পদক্ষেপ করা হবে।

সর্বোপরি, আরজি কর কাণ্ডের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে এবং হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করতে প্রতি সপ্তাহে সিভিল ড্রেসে বা সাদা পোশাকে পুলিশ হাসপাতাল চত্বর জুড়ে বিশেষ টহল দেবে। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এসএসকেএম হাসপাতালের বৈঠকে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার স্বার্থে যে বিশেষ আইডি কার্ড বা পরিচয়পত্রের কথা ঘোষণা করেছিলেন, সোমবারের বৈঠকে সেই কার্ডের চূড়ান্ত নকশা বা ডিজাইন অনুমোদন করা হয়েছে। এই বিশেষ পরিচয়পত্রে থাকবে সরকারি হলোগ্রাম ও স্ট্যাম্প। এই নির্দিষ্ট ডিজিটাল কার্ড ছাড়া এখন থেকে হাসপাতালের মূল ওয়ার্ড বা স্পর্শকাতর বিভাগে বহিরাগত বা বিনা অনুমতিতে কারও প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সোমবারের এই মেগা বৈঠকের পর স্পষ্ট, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বড়সড় ‘অপারেশন ক্লিন’ চালাতে পুরোপুরি তৈরি শুভেন্দু সরকার।