কোন পথে চলেছি আমরা
আরএসএস এমন এক জাতীয়তাবাদী জঙ্গি সংগঠন যা ভারতকে একটি হিন্দু দেশ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।
নোটন কর (গণ আন্দোলনের কর্মী): ভারতের বর্তমান শাসক দল বিজেপি হল হিন্দুত্ববাদী আরএসএস-এর রাজনৈতিক শাখা। আরএসএস ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ঠিক সেই সময়ে হিটলার জার্মানিতে তাঁর রাজনৈতিক ভিত শক্তপোক্ত করার চেষ্টা করছিল। আরএসএস-এর মূল লক্ষ্য হিন্দু রাষ্ট্র গঠন। আরএসএস এমন এক জাতীয়তাবাদী জঙ্গি সংগঠন যা ভারতকে একটি হিন্দু দেশ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।
আরএসএস-এর সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বিশ্বের ফ্যাসিস্ট ও আধা সামরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে অনেক মিল পাওয়া যায়। যেমন ইউনিফর্ম পরা, বিশেষ ভঙ্গিমায় স্যালুট ঠোকা, পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি। আর তাদের উভয়ের আদর্শিক চেতনার কেন্দ্রে রয়েছে উগ্র জাতীয়তাবাদ যা একটি ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যাগুরু শ্রেণিকে আগে থেকেই কোণঠাসা হয়ে থাকা সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলে। গত দশকে ভারতে সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর ওপর, বিশেষ করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের সহিংসতার সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়েছি।
গরু সম্পর্কিত গণপিটুনি, দাঙ্গা, মুসলিমদের বাড়িঘর পুড়িয়ে বা গুঁড়িয়ে দেওয়া, হিন্দু নারীর সঙ্গে মুসলিম পুরুষের প্রেমকে ‘লাভ জিহাদ’ আখ্যা দিয়ে অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা, সরকারি প্রতিষ্ঠানে হিজাবকে খারাপ পোশাক হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের মাধ্যমে ধর্মীয় পরিচয়কে পরীক্ষার মুখে ফেলে মুসলিমদের আতঙ্কিত করা এবং সমান অধিকার সম্পন্ন নাগরিকত্বের মর্যাদা থেকে তাঁদের সরিয়ে রাখার পদ্ধতিগত প্রচেষ্টা ইত্যাদি মোদির প্রধান মন্ত্রিত্বকালের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৩৯ সালের মার্চে আরএসএস-এর প্রধান তাত্ত্বিক এমএস গোলওয়ালকর উই, অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড নামে একটি বই লিখেছিলেন। ওই বইয়ে তিনি আরএসএস-এর হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের নকশা তুলে ধরেছিলেন। তিনি এই বইয়ে লিখেছেন– ‘জার্মান হিসেবে জাতীয় গর্ব আজকের আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। নিজ জাতি এবং সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে জার্মানি সেমেটিক জাতিদের তথা ইহুদিদের নির্মূল করে বিশ্বকে একটি ধাক্কা দিয়েছে। জাতি হিসেবে গৌরব বোধ করার সর্বোচ্চ পর্যায়টি এখানে প্রকাশিত হয়েছে। জার্মানি দেখিয়েছে, জাতি এবং সংস্কৃতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য থাকা অবস্থায় সর্বাংশে এক জাতি হওয়া কতটা অসম্ভব। এটি হিন্দুস্থানে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় ও লাভবান হওয়ার একটি ভাল উদাহরণ।’ তিনি আরও লিখেছেন, ভারতের সব ‘অ-হিন্দু’ লোকদের সম্পূর্ণরূপে হিন্দু সংস্কৃতিতে একীভূত হতে হবে অথবা ‘… তাদের দেশের মধ্যে হিন্দু জাতির সম্পূর্ণ অধীনস্থ হয়ে থাকতে হবে, তারা কিছু দাবি করার যোগ্য হবে না, কোনও সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবে না এবং নাগরিকত্বের অধিকারও তারা পাবে না।’
বিজেপি এই উদাহরণকে গভীরভাবে গ্রহণ করেছে। দলটির স্থানীয় নেতা ও কর্মীরা মুসলিমদের আকারে ইঙ্গিতে এবং ক্ষেত্র বিশেষে সরাসরি বহিরাগত হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁরা মুঘল আমলে নির্মিত মসজিদগুলোর টিকে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিজেপি মুসলিমদের কোণঠাসা এবং রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক করার জন্য সংগঠিতভাবে দেশে চেষ্টা চালাচ্ছে। এর ফল হিসেবে আমরা দেখতে পাই, বিধানসভা ও লোকসভায় দলটির নির্বাচিত সাংসদদের মধ্যে একজনও মুসলিম নেই।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার আগে মোদি পেয়েছিলেন মুৎসুদ্দি (ক্রোনি) পুঁজিপতিদের সমর্থন৷ আমরা যদি বিজেপির শেষ পাঁচ বছরের কার্যসূচি দেখি, তা হলে দেখব রামমন্দির, ঘরওয়াপসি, লাভ জিহাদ, গো-রক্ষা ইত্যাদি আরএসএস-এর যাবতীয় স্বপ্নকে বিজেপি একে একে বাস্তবায়িত করেছে এবং ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে প্রতিষ্ঠা করেছে ভারতে৷
বুলগেরিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জর্জি দিমিত্রভ ফ্যাসিবাদকে সর্বাপেক্ষা সুসংহতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কাছ থেকে আমরা জেনেছি যে ফ্যাসিবাদ হল ‘লগ্নি পুঁজির সর্বাপেক্ষা প্রতিক্রিয়াশীল অংশের শাসন।’ সুতরাং ফ্যাসিবাদ সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণির শাসন নয়।
আজ আমাদের দেশে যে ফ্যাসিবাদী লক্ষণগুলি লক্ষণগুলি দেখা যাচ্ছে সেগুলো হল— উগ্র জাতীয়তাবাদ, মানবাধিকারের প্রতি অবজ্ঞা, শত্রু বা বলির পাঁঠা হিসেবে কোনও গোষ্ঠীকে শনাক্ত করা, সামরিক আধিপত্য, ইতিহাস বিকৃত করা, নারীকে পুরুষ আধিপত্যাধীন করা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার খর্ব করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কুসংস্কার বিস্তার, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও কর্পোরেট পুঁজির ব্যাপক বিস্তার। উল্লেখিত সবগুলো লক্ষণ এখন আমাদের দেশের সঙ্গে মিলে যায়। অপরদিকে দেশে মোদির জমানায় অভ্যন্তরীণ তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র উঠে আসে। বর্তমান ভারতে নব্য ধনবান শ্রেণির লুঠপাট ও শোষণ মাত্রাছাড়া হয়ে ওঠেছে বিজেপির শাসন আমলে। উক্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য পরিষ্কার পাওয়া যায়।
ভারতের মুৎসুদ্দি (ক্রোনি) বেনিয়ারা আপাতত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে ধর্মীয় বিভাজন ও উগ্র জাতীয়বাদের মডেলটিই তাঁদের অর্থনৈতিক লুঠপাটের জন্য এখন সর্বাধিক কার্যকর। কেন? এই লুঠপাট অব্যাহত রাখতে এবং দেশের জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে প্রয়োজন দেশের সার্বিক অবনতির জন্য কাঠগড়ায় তোলা কোনও এক গোষ্ঠীকে৷ এক্ষেত্রে এই গোষ্ঠী হল মুসলিম বা দলিত। সার্বিক অবনতি ভুলিয়ে দিতে আরও দরকার অন্ধ জাত্যাভিমানের নেশা, এক্ষেত্রে সেই কাজটিই করছে ‘হিন্দুরাষ্ট্রের’ স্বপ্ন। হিন্দু মহাসভা ও আরএসএস ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেয়নি, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এরা ব্রিটিশ বাহিনীকে সাহায্য করেছে। তাই পথ ধরেছে ইতিহাস বিকৃত করার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সিলেবাস পাল্টে দিতে।
ইদানীং বাঙালি জাতিসত্ত্বার ওপর আরএসএস-বিজেপির আক্রমণ তীব্র হয়েছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলাদেশি তকমা দিয়ে গ্রেফতার ও নির্যাতন করা হচ্ছে এবং কোথাও জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া (পুশব্যাক) হয়েছে। দেশে বিশেষ করে আমাদের রাজ্যে এসআইআর-এর নাম করে মুসলিম জনগোষ্ঠী সহ অন্যান্য সংখ্যালঘু, প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষকে বে-নাগরিক করার চক্রান্ত করছে।
কেন আরএসএস-বিজেপি বাঙালি জাতিসত্ত্বার উপর আক্রমণ করতে চাইছে? এর কারণ নিহিত আছে ঐতিহাসিকভাবেই বাঙালির প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার মধ্যে। বাঙালির স্বাধীনতা আকাঙ্খা, লড়াই, আন্দোলন এবং মনীষীদের নবজাগরণ বার্তা বরাবরই আরএসএস-বিজেপির কাছে আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পশ্চাদপসরণ, আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোর ক্ষয় ও পরাজয়, সাম্রাজ্যবাদী এবং বড় বুর্জোয়াদের ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। তারপর নয়া উদারবাদের সূচনা, ২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী মন্দা ও তার পরিণতিতে প্রায় সারা বিশ্ব সহ আমাদের দেশে নয়া ফ্যাসিবাদের উত্থান সাধারণ মানুষের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙেচুরে তছনছ করে দিয়ে একটা লুঠের সাঙ্গাৎতন্ত্রের অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। দেশে যদি গণতন্ত্র না থাকে, যদি ফ্যাসিবাদ আরও দৃঢ় হয়, যদি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলো শক্তিশালী না হয় তা হলে আগামীদিনে দেশের কোটি কোটি খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ অর্থনৈতিকভাবে আরও পঙ্গু ও বিপর্যস্ত হয়ে যাবে।
সুতরাং, আগামীদিনে এই রাজ্যের বিধানসভায় বিজেপি যদি জিতে আসে, তা হলে দেশসহ রাজ্যের শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত মানুষের অবস্থা যে আরও ভয়াবহ হবে এবিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। এই পরিপ্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলিকে আরও ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হতে হবে।






