নবাবের থেকে পেয়েছিলেন ‘মল্লিক’ উপাধি, হরফ আবিস্কারের সফল পথিকৃৎ পঞ্চানন কর্মকার
পঞ্চানন জমিদার রাজা পুর্ণেন্দু রায়ের বাড়িতে ধাতব তৈজসপত্রাদিতে লিপিকরণের কাজে যোগ দেন।
এম এ নাসের: প্রাচ্য ভাষার হরফ শিল্পের পুরোধা, হরফ আবিস্কারের সফল পথিকৃৎ পঞ্চানন কর্মকার ১৭২০ সালে হুগলি জেলার বলাগড় থানার অন্তর্গত জিরাট গ্ৰামে জন্মগ্ৰহণ করেন (Panchanan Karmakar)। পিতা শম্ভুচন্দ্র কর্মকার, পিতামহ নিমাইচন্দ্র কর্মকার নবাব আলিবর্দী খাঁ-র খোদাই শিল্পীরূপে ‘মল্লিক’ উপাধি গ্ৰহণ করেন। হুগলি জেলার শ্রীরামপুর শহরের অদূরে বড়া গ্ৰামে কিছু সময় অতিবাহিত করেন। এরপর সপরিবারে শ্রীরামপুরের বটতলা এলাকায় কোম্পানি পুকুর অঞ্চলে বসতবাটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে এই অঞ্চল বহুতল ভবনে আবৃত। পঞ্চানন জমিদার রাজা পুর্ণেন্দু রায়ের বাড়িতে ধাতব তৈজসপত্রাদিতে লিপিকরণের কাজে যোগ দেন।
[আরও পড়ুন: Monsoon Forecast: সপ্তাহান্তে কিছুটা স্বস্তি, তবে সোমবার ফের আসছে বৃষ্টি]
হরফ শিল্পের উদ্ভাবক জার্মান হরফ শিল্পী গুটেনবার্গ। রোমান অক্ষরের আকৃতি সরল, মাত্র ছাব্বিশটি অক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কোনও যুক্তাক্ষর ছিল না। কিন্তু বাংলা অক্ষর অত্যন্ত জটিল এবং যুক্তাক্ষর যুক্ত। ১৭৭০ সালে দুর্ভিক্ষে তাদের পরিবার জিরাট ত্যাগ করে বাঁশবেড়িয়া অবস্থান করে কামারশালা তৈরি করে বসবাস আরম্ভ করেন। তিনি ধাতুর অলংকার, খোদাই ও লেখার কাজে দক্ষ ছিলেন।
১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে তিনিই প্রথম ভারতবর্ষে দেবনাগরী ভাষায় হরফ নির্মাণ করেন। কেরির সংস্কৃত ব্যাকরণ মুদ্রণের জন্য তিনি দেবনাগরী ভাষায় হরফ তৈরি করেন। পরে তিনি আরো ছোটো ও সুন্দর এক স্পষ্ট বাংলা হরফের নকশা তৈরি করেন। বাংলা মুদ্রণশিল্পে পঞ্চানন কর্মকারের তৈরি হরফের নকশা দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত ছিল।
১৭৭৮ সালে প্রকাশিত হ্যালহেডের ব্যাকরণ গ্ৰন্থ, ‘A grammar of the Bengal Language’-তে অক্ষর ব্যবহ্নত হয়।চুঁচুড়াতে বাংলা ভাষার হরফ নির্মাণের প্রথম কেন্দ্র ছিল। পরে ধাতুর হরফ নির্মাণের মধ্য দিয়েই ছাপার কাজের আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টা হয় (Panchanan Karmakar)। ইতিপূর্বে দক্ষিণ ভারতের মিশনারীদের মধ্যে হরফ নির্মাণের চেষ্টা সামান্য হলেও সফল হয়। ওলন্দাজ যুবক উইলিয়াম বোল্টান কলকাতায় প্রেস প্রতিষ্ঠা করার প্রেরণা পান।বোল্টন লন্ডনে বাংলা হরফ তৈরিতে বিফল হন। চার্লস উইলকিল পঞ্চাননের সহায়তায় বাংলা হরফ আবিস্কারে সফল হন। পঞ্চাননের অসাধারণ দক্ষতা ও কৃতিত্বের বিকাশে সম্ভব হয়েছিল ওয়ারেন হেস্টিংস, ন্যাথনিয়েল হ্যালিহেড ও চার্লস উইলকিন্সের যৌথ প্রচেষ্টায়।
পঞ্চানন কর্মকারের সঙ্গে চালর্স উইলকিন্সের পরিচয় সম্পর্কে জন ক্লার্ক মার্শম্যান লিখেছেন,”Soon after the establishment of the press at serampore, the native blacksmith punchanon, who had been in instructed in the art of punch cutting by sir charles wilkins, to whom allusion had been made in a former chapter, came to the missionarmies in search of comployment.”। (The life and times of carey marshman and ward-Jon Marshman)
১৭৭৯ সালে কলকাতায় কোম্পানির যে প্রেস স্থাপিত হয় উইলকিন্সের দায়িত্বে, সেখানে পঞ্চানন কর্মকারও ছিলেন। ১৭৮৬ সালে উইলকিল ইংল্যান্ড প্রত্যাবর্তন করলেও পঞ্চানন কোম্পানির হরফ কারখানায় কর্মরত ছিলেন। ১৮০০ সালের মে মাসে পঞ্চাননের সহযোগিতায় শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনারীদের প্রেসের কাজ শুরু হয়।
[আরও পড়ুন: মানসিক রোগে ভুগছে সাতজনের মধ্যে একজন! যুবসমাজে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি: WHO]
উইলিয়াম কেরি, ওয়ার্ড ও পঞ্চাননের সমবেত প্রচেষ্টায় মুদ্রণের সূচনা হয়। পঞ্চাননের হরফ, কেরির মুদ্রণের বিষয়বস্তু ও ওয়ার্ডের মুদ্রণের ফলে ৬০৩ পৃষ্ঠার পুস্তক দুই হাজার কপি ছাপা হলেও প্রতি কপির ব্যয় ও দাম ধার্য হয়। ১৮০১ সালে কেরির অনুবাদ করা বাংলা বাইবেলের ছাপা হরফে হয়। টাইপ ঢালাই কারখানার প্রধান ছিলেন পঞ্চানন কর্মকার (Panchanan Karmakar)। এই কারখানায় বাংলা, বর্মী, চিনা, গুজরাটি, গুরুমুখী, কৈবি, নাসকী, দেবনাগরী, তিব্বতী, সিংহলী, জাপানীজ, ইন্ডিকা, নাসতালিক, সারদা, ওড়িয়া, তেলেগু, তামিল, প্রভৃতি হরফ তৈরিতে স্বয়ং পঞ্চানন, দৌহিত্র কৃষ্ণচন্দ্র, ভ্রাতা গদাধর, জামাতা মনোহরের যৌথ চেষ্টায় সম্ভব হয়। ১৮০৩ সালে কেরি তাকে নাগরি অক্ষরের সাট রচনায় নিযুক্ত করেন। শ্রীরামপুরের কোম্পানি পুকুর অঞ্চলে পঞ্চানন,কন্যা লক্ষ্মীমণি, জামাতা মনোহর মিস্ত্রী, ভ্রাতা গদাধর বসবাস করতেন।অবশেষে হরফ আবিস্কারের জনক, শ্রীরামপুরের তত্ত্বের ফলিত প্রয়োগের পুরাধা ১৮৩৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মৃত্যু বরণ করেন।






