সম্পাদকীয়

BJP: পে-লোডারে করে মানুষ ছুড়ে ফেলে কেন্দ্র, বাঙালি বিদ্বেষকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়?

তথাকথিত ‘বাংলাদেশি’ বলে যাদের ‘পুশ ব্যাক’ করা হয়েছে, তার বড় অংশই আসলে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা।

সুমন ভট্টাচার্য: একজন জীবন্ত মানুষকে অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে পে লোডার দিয়ে কাঁটাতারের ওপাশে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে (BJP)। আজকের ভারতবর্ষে এই দৃশ্য দেখার পর আপনি কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সম্পর্কে ঠিক কী মনে করবেন? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কি অমিত শাহকে এতটাই ছাড় দিচ্ছেন, যে তিনি এবং তাঁর দফতর যা ইচ্ছে, তাই করতে পারেন? নাকি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগটা ঠিক, যে কেন্দ্রে এবং দলে ‘২ নম্বর’ অমিত শাহ হাতে সুযোগ পেলে মানুষের গর্দান কেটে নিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেন না। গত কয়েক মাসে বাংলাদেশি সন্দেহে বিএসএফ-কে দিয়ে ‘পুশ ব্যাক’-এর যে সব ঘটনা সামনে এসেছে এবং তথাকথিত ‘বাংলাদেশি’ বলে যাদের ‘পুশ ব্যাক’ করা হয়েছে, তার বড় অংশই আসলে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা।

[আরও পড়ুন: ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ প্রকল্পের এসওপি প্রকাশ নবান্নের]

শুধুমাত্র সন্দেহের বশে এবং কাগজপত্র না দেখেই তাদের অমিত শাহের বিএসএফ ‘পুশ ব্যাক’ করেছে, সেই সম্পর্কে আসলে আমরা ঠিক কী ভাবছি (BJP)? ভাবনাটা এই কারণে দরকার, যে পে লোডারে যাঁকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে, তিনি হয়তো বাঙালি মুসলিম। কিন্তু বাঙালি হিন্দুও কি নিরাপদ? ওড়িশায়, মহারাষ্ট্রে মতুয়াদের গ্রেফতার এবং হয়রানির পর বাঙালি হিন্দুও কি নিশ্চিন্তে বলতে পারবে, যে বিজেপি তাদের জন্য ‘রামরাজ্য’ দিতে পারে? আসলে এই সংকট বাঙালির। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে বাঙালির। বিজেপি যে বাঙালিকে নিশানা করেছে এবং যে বাঙালিকে ‘বাংলাদেশি’ বলে দেগে দিয়ে আজকের ভারতবর্ষে নতুন ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ বা ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ তৈরি করতে চাইছে, তার সম্পর্কে কি আমরা সচেতন হব না? বুঝব না যে আসলে বিজেপি ঠিক কী চাইছে? কতটা ‘বাঙালি বিদ্বেষী’ হলে একজন জীবন্ত মানুষকে পে লোডারে করে কাঁটাতারের ওপারে ছুড়ে ফেলে দেওয়া যায়?

একসময় বাংলাদেশে ‘রাজাকার’ বলতে বোঝাত যারা বাংলাভাষীদের বিরুদ্ধে (BJP) পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করত। অর্থাৎ, যারা অত্যাচারী, বাঙালি মহিলাকে ধর্ষণকারী, বাঙালিদের উপর অত্যাচারকারী পাক সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়িয়েছিল। এই ‘রাজাকার’ শব্দটিকে ঘিরে তাই বাংলাদেশে তীব্র ঘৃণা ছিল। যদিও আজকের ইউনুস শাসিত বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সেই ‘রাজাকার’ শব্দটি হয়তো কারও কারও কাছে ‘গর্বের উপাধি’ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবাংলায় আমরা ‘রাজাকার’ বলতে কাদের বুঝব?

যারা এই বিএসএফের অন্যায় আচরণকে সমর্থন করছে, অর্থাৎ, বিজেপির সমর্থক এবং নেতাদের, যারা মনে করছে যে, বাংলাদেশিদের বা অনুপ্রবেশকারীদের সীমান্তের ওপারে ‘পুশ ব্যাক’ করা হচ্ছে, তাদের কি আমরা ‘রাজাকার’ বলব না? কেন তাঁদের ‘রাজাকার’ বলছি? কারণ, তাঁরা বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে (BJP) এই ষড়যন্ত্রের অংশ। কিন্তু যাঁরা এই ষড়যন্ত্রে অংশ নিচ্ছেন, যাঁরা ভাবছেন কেন্দ্রের গেরুয়া শিবিরের ‘দালালি’ করলে বিরাট পুরস্কার মিলবে, তাঁরা যেন একবার জগদীপ ধনখড়ের পরিণতি দেখে নেন। জাঠ এই রাজনীতিক পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এবং বাঙালির বিরুদ্ধে যাবতীয় কথাবার্তা বলে কেন্দ্রের উপরাষ্ট্রপতির পদ পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির সরকারের সঙ্গে সংঘাতের পর মাত্র চার ঘণ্টার নোটিশে তাঁকে পদত্যাগপত্র দিয়ে চলে যেতে হয়েছে। অর্থাৎ তুমি যদি নিজের আদর্শ, বিবেকের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনও অন্যায়কে সমর্থন করো, আসলে তুমি আদর্শগতভাবে ‘রাজাকার’ হয়ে যাও, তা হলে তোমার পরিণতি জগদীপ ধনখড়ের মতোই হতে পারে।

সুখের কথা, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বাদে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই ‘বাঙালি বিদ্বেষ’-এর ইস্যুতে রাস্তায় নেমে গিয়েছে। কংগ্রেস-সিপিএম নেমেছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে রাস্তায় নেমে মিছিল করেছেন, ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে তিনি আবার ভাষা আন্দোলন শুরুর ডাক দিয়েছেন। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও ‘বাঙালি অস্মিতা’র প্রশ্নে আন্দোলনের উপর জোর দিয়েছেন। বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের মধ্যে দেশ বাঁচাও গণমঞ্চও রবিবার পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করছে। অর্থাৎ নাগরিক সংগঠনগুলি, দেশ বাঁচাও গণমঞ্চের মতো সচেতন সংগঠনগুলি ইতিমধ্যেই বুঝতে পেরেছে, যে বাঙালি জাতি কতটা সংকটে পড়ে গিয়েছে।

বাঙালি জাতিকে এইভাবে অর্থাৎ যেভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে হিটলার ইহুদিদের প্রতি আচরণ করতেন, সেইভাবে যে স্বাধীন ভারতবর্ষে বাঙালিদের প্রতি আচরণ করা হবে, তা বোধহয় কেউ ভাবেনি। বিশেষত যে বাঙালির রক্তে (BJP), যে বাঙালির শৌর্যে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা প্রাপ্তি হয়েছে। আন্দামানের সেলুলার জেলে অমিত শাহের পরিচিত কতজনের নাম আছে, তা জানি না। কিন্তু আমাদের অর্থাৎ বাঙালির পরিচিত অনেক বিপ্লবীর নাম আছে। শুনেছি আরএসএসের এক ঘরোয়া বৈঠকে একবার অসমের এক বাঙালি নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীকে এই কথা শুনিয়েও দিয়েছিলেন। কৈলাস বিজয়বর্গীর আসলে জানা ছিল না, যে ‘বর্গী’ শব্দটার সঙ্গে বাঙালির কতটা ঘৃণা জড়িয়ে আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বিজেপি আবার পশ্চিমবঙ্গে সেই ‘ঘৃণার রাজনীতি’ শুরু করেছে। এবং সেই ঘৃণাকে এমন চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে, আবারও বলছি যে, পে লোডার দিয়ে মানুষকে সীমান্তের ওপারে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ রাখার দরকার নেই যে আরএসএস বা সাভারকার নাৎসি আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। তাঁরা নাৎসিদের মতোই একটি খাঁটি রক্তের ভারতবর্ষ তৈরির কথা ভাবেন। সেই খাঁটি রক্ত হিন্দুর হতে হবে এরকম যাঁরা মনে করছেন, তাঁরা কিন্তু ভুল ভাবছেন। আসলে সেটা উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণের একটা আধিপত্যবাদ দেখানোর জায়গা হতে হবে। সেই ভারতবর্ষে দলিত প্রান্তিক এবং অবশ্যই মুসলিমদেরও কোনও জায়গা থাকবে না। সেইজন্যেই উত্তরবঙ্গের রাজবংশী থেকে নদিয়ার মতুয়া কিংবা মুর্শিদাবাদের মুসলিমরা সবাই নিশানায়। এবং শুধু তো নিশানায় নয়, তাদের বাংলাদেশি বলে দেগে দিয়ে একেবারে নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এই যে নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা বা বাঙালিকে (BJP) ডি-ভোটার করে দেওয়ার চেষ্টা এটা আসলেই নাৎসি বাহিনীর ইহুদিদের উপর নামিয়ে আনা একটা দমন-পীড়নের চক্রান্ত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর সময়কে কাটিয়ে একদিন ইহুদিরা স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছে। সেই ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল অবশ্য আজ আবার গাজার উপর ভয়াবহ অত্যাচার নামিয়ে এনেছে। কিন্তু বাঙালি কি আজকের ভারতবর্ষে সত্যিই নতুন ইহুদি? তাদের কি এইভাবেই ট্রিট করবে কেন্দ্রের বিজেপি বা বিএসএফ? কবে বাঙালি বিবেক জাগবে? কবে বাঙালি কবিরা বুঝবেন যাবতীয় কবিতা, অ্যাকাডেমি-নন্দন চত্বরে শিল্পচর্চা, পুজো সংখ্যা বগলে বেরিয়ে পড়া— এই সব কিছুই ম্লান হয়ে যেতে পারে, যদি বাঙালি ‘আইডেন্টিটি’ আর না থাকে।

FB POST: https://www.facebook.com/share/v/15jvwBryP3/

যদি নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা সাফল্যের সঙ্গে বাঙালিকে (BJP) ডি-ভোটার করে দিতে পারেন। তেজস্বী যাদব বিহারের নির্বাচন বয়কট করার কথা ভাবছেন, অর্থাৎ ভারতবর্ষের গণতন্ত্র এমন একটা জায়গায় যাচ্ছে, যেখানে প্রধান বিরোধী দলকে নির্বাচন থেকে দূরে সরে থাকার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। পুবের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ এবং পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে যেভাবে নির্বাচন পরিচালনা হতো এবং হয়, ভারতবর্ষও কি সেই মডেলে এগোচ্ছে, যেখানে প্রধানতম রাজনৈতিক দলগুলিকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করছে কেন্দ্রের শাসকদল? এ কোন ধরনের স্বৈরতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদের দিকে ভারতবর্ষকে এরা ঠেলে দিচ্ছে? সেই প্রশ্নের উত্তর বাঙালিকেই খুঁজতে হবে এবং বাঙালিকেই প্রতিবাদের পথও চিনে নিতে হবে।

Related Articles