সম্পাদকীয়

অলীক পর্দার আড়ালে হারানো মানুষ

আমরা দূরের অচেনা মানুষের গল্পে মুগ্ধ হই, অজানা কণ্ঠের মায়ায় জড়িয়ে পড়ি, অপরিচিত মুখের হাসিতে বিশ্বাস করি

প্রভাত কুমার মিত্র (লেখক— বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও প্রাবন্ধিক): আমরা এক অদ্ভুত সময়ের মধ্যে বাস করছি। হাতের মুঠোয় ছোট্ট পর্দা, অথচ তার ভেতরে বিশাল এক জগৎ। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব— এই নামগুলি এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঘুম ভাঙে এদের সঙ্গে, ঘুম আসে এদের সঙ্গেই। যেন এদের বাইরে আর কোনও বাস্তব নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হল— এই বাস্তব কি সত্যিই বাস্তব?

আমরা দূরের অচেনা মানুষের গল্পে মুগ্ধ হই, অজানা কণ্ঠের মায়ায় জড়িয়ে পড়ি, অপরিচিত মুখের হাসিতে বিশ্বাস করি। চেনা মানুষগুলো— যাদের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ সম্পর্ক, সুখ-দুঃখের ইতিহাস— তারা যেন ধীরে ধীরে প্রান্তে সরে যাচ্ছে। পাশের বাড়ির মানুষটির খবর রাখার সময় নেই, অথচ হাজার মাইল দূরের কারও স্ট্যাটাসে আমরা আবেগে ভেসে যাই। এই যে বিনিময়— একি সত্যিকারের সম্পর্ক, না কি এক ধরনের ভার্চুয়াল মায়াজাল?

মানুষ চিরকাল স্বপ্ন দেখেছে। বৈভব, খ্যাতি, সাফল্য— এসবের আকাঙক্ষা মানব মনের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু আজ আমরা মনে করছি, কেবল প্রদর্শনই সাফল্য। সুখ না থাকলেও সুখের ছবি থাকতে হবে; শান্তি না থাকলেও শান্তির পোস্ট থাকতে হবে। আমরা যেন নিজেকে নয়, নিজের একটি সাজানো সংস্করণকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে ব্যস্ত। এই আত্মপ্রবঞ্চনাই ধীরে ধীরে আমাদের অন্তর্গত সত্যকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। সিনেমার পর্দা আর বাস্তবের পার্থক্য ঘুচে যাচ্ছে। পর্দার জীবন সর্বদা নাটকীয়, উজ্জ্বল, ত্বরিত। বাস্তব জীবন ধীর, সাধারণ, কখনও একঘেয়ে। কিন্তু সেই সাধারণতার মধ্যেই তো গভীরতা, ছন্দ, স্থায়িত্ব। আমরা যখন সাধারণ জীবনকে অস্বীকার করি, তখন নিজের অস্তিত্বের ভিত্তিকেই অস্বীকার করি। ফলে অন্তরে জন্ম নেয় এক অদ্ভুত শূন্যতা— যা ভরে না লাইক-কমেন্টে, ভরে না অনুসারীর সংখ্যায়।

এই আত্মপ্রবঞ্চনার কারণ কী?

প্রথমত, আমরা নিজেকে যথেষ্ট বলে মানতে পারি না। তুলনার আগুনে পুড়ে আমরা ভাবি— অমুকের আছে, আমার নেই। দ্বিতীয়ত, একাকিত্বের ভয় আমাদের তাড়া করে। তাই আমরা ভার্চুয়াল কোলাহলে নিজেকে ডুবিয়ে রাখি, যেন নিঃশব্দে নিজের সঙ্গে মুখোমুখি হতে না হয়। তৃতীয়ত, দ্রুত সাফল্যের লোভ— যেখানে শ্রম, সময়, সম্পর্কের গভীরতা সবকিছু উপেক্ষিত। কিন্তু এই পথ সুখের নয়। এ এক নিঃশব্দ আত্মবিনাশের প্রক্রিয়া। মানুষ সামাজিক প্রাণী— তার প্রয়োজন স্পর্শ, দৃষ্টি, আন্তরিক কথা, সহচর্য। এগুলো কোনও অ্যাপ দিতে পারে না।

তা হলে উত্তরণের পথ কী?

প্রথমত, সচেতন বিরতি। প্রতিদিন কিছু সময় প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা-নিজের সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে। দ্বিতীয়ত, চেনা মানুষদের কাছে ফেরা। প্রতিবেশীর দরজায় কড়া নাড়া, পুরনো বন্ধুকে হঠাৎ দেখা করতে যাওয়া— এই ছোট ছোট কাজই সম্পর্কের উষ্ণতা ফিরিয়ে আনে। তৃতীয়ত, নিজের অন্তর্জগতকে শোনা। ডায়েরি লেখা, বই পড়া, প্রার্থনা বা ধ্যান— যা-ই হোক, এমন কিছু যা আমাদের ভিতরের নীরব সত্তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে।

সবচেয়ে বড় কথা, সুখকে প্রদর্শনের বস্তু নয়, অনুভবের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। সুখ মানে সবসময় উল্লাস নয়; কখনও তা শান্ত দুপুর, কখনও পরিবারের সঙ্গে নিরাভরণ হাসি, কখনও নিজের কাজের মধ্যে নিমগ্ন থাকা।

আমরা যদি আবার সহজ, স্বাভাবিক, ছন্দময় জীবনের দিকে ফিরতে পারি, তবে বুঝব জীবনের আসল রূপ পর্দার আড়ালে নয়, চোখের সামনে। আত্মপ্রবঞ্চনা ছেড়ে আত্মসম্মুখীন হওয়াই মুক্তির প্রথম ধাপ। আমরা আজ এক অদ্ভুত আত্মতৃপ্তির যুগে বাস করছি। প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে মহাপুরুষদের বাণী, আরাধ্য দেবতার ছবি, জ্ঞানগর্ভউক্তি পোস্ট করি। সেই পোস্টে লাইক পড়ে, মন্তব্য আসে-আর আমাদের ভিতরে এক ধরনের মৃদু আত্মপ্রসাদ জন্ম নেয়। মনে হয়, আমরা যেন সত্য, ধর্ম, নীতি ও জ্ঞানের পক্ষেই দাঁড়িয়ে আছি।

কিন্তু প্রশ্ন হল— এই অবস্থান কি সত্যিই আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হয়?

আমরা হয়তো স্বামী বিবেকানন্দর বাণী শেয়ার করি ‘উঠো, জাগো, লক্ষ্য না পাওয়া পর্যন্ত থেমো না।’ কিন্তু নিজের আলস্য, ভয় বা স্বার্থপরতা কাটাতে কি সত্যিই উঠি? আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদী কবিতা পোস্ট করি, কিন্তু ভিন্নমতের মানুষকে কি সম্মান করি? আমরা কৃষ্ণ-র উপদেশ স্মরণ করি, কিন্তু নিজের কর্মক্ষেত্রে বা পরিবারে কি সত্যিই ন্যায় ও সংযম পালন করি?

এই দ্বৈততা আমাদের সময়ের এক গভীর সঙ্কট।

আমরা যা বিশ্বাস করি না, তা-ই প্রচার করি। যা পালন করি না, তা-ই ঘোষণা করি। কেন? কারণ ঘোষণা সহজ, অনুশীলন কঠিন। পোস্ট করা সহজ, পরিবর্তন কঠিন। নিজের ভিতরের লোভ, হিংসা, ক্ষুদ্রতা, বিদ্বেষের মুখোমুখি হওয়া কঠিন। তাই আমরা এক ধরনের বাহ্যিক ধার্মিকতা বা জ্ঞানচর্চার মুখোশ পরে থাকি।

এ যেন এক আয়নার খেলা। আমরা নিজের কাছে নয়, অন্যের চোখে বড় হতে চাই। নিজের চরিত্রের গভীরতা বাড়ানোর চেয়ে নিজের ভাবমূর্তির উচ্চতা বাড়াতে ব্যস্ত থাকি। ফলে আত্মপ্রচার বাড়ে, আত্মসমালোচনা কমে।

সবচেয়ে ভয়াবহ হল— আমরা চাই অন্যেরা পাল্টাক। সমাজ বদলাক, রাজনীতি বদলাক, পৃথিবী বদলাক। কিন্তু ‘আমি’ যেন অক্ষত থাকি। আমার স্বার্থ, আমার অভ্যাস, আমার স্বাচ্ছন্দ্য-এসব অপরিবর্তিত থাকুক। এই মানসিকতাই প্রকৃত পরিবর্তনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

আসলে পরিবর্তন সর্বদা ভিতর থেকে শুরু হয়। ইতিহাসে যাঁরা সত্যিকারের মহাপুরুষ হয়েছেন, তাঁরা প্রচার দিয়ে নয়, জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন। তাঁদের বাণী শক্তিশালী হয়েছে কারণ তা তাঁদের জীবন থেকে উৎসারিত। কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্যই তাঁদের মহত্ত্বের ভিত্তি।

আমরা যদি সত্যিই কোনও বাণীকে শ্রদ্ধা করি, তবে সেটিকে পোস্ট করার আগে নিজের জীবনে একটু স্থান দিতে পারি না? যদি আমরা প্রতিদিন একটি ছোট অভ্যাস বদলাই একটু কম রাগ করি, একটু বেশি সহানুভূতিশীল হই, একটু কম নিন্দা করি তবে সেই পরিবর্তনই সবচেয়ে বড় পোস্ট হবে।

নিজেকে পাল্টানো মানে একদিনে সাধু হয়ে যাওয়া নয়। বরং প্রতিদিন সামান্য সচেতনতা। নিজের ভ্রান্তি স্বীকার করার সাহস। নিজের দুর্বলতাকে ঢাকার বদলে তা সংশোধনের চেষ্টা।

যে দিন আমরা বাহ্যিক প্রদর্শনের চেয়ে অভ্যন্তরীণ সততাকে বড় করে দেখব, সে দিন আর মহাপুরুষদের বাণী দিয়ে নিজেকে সাজাতে হবে না। আমাদের নীরব জীবনই হবে সেই বাণীর প্রতিধ্বনি।

পৃথিবী বদলানোর আগে, নিজেকে বদলানোর সংকল্পই হোক আমাদের সত্যিকারের সাধনা।

অলীক লুকোছাপার জগৎ ছেড়ে যদি আমরা বাস্তবের মাটিতে পা রাখি, তবে হয়তো আবার ফিরে পাব সেই হারিয়ে যাওয়া শান্তি— যা কোনও অ্যাপের নয়, কেবল মানুষের।