রামমোহন রায়কে এই ভাবে অপমান! আর কত সহ্য করবে বাংলার মানুষ?
নবজাগরণের প্রাণপুরুষ রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, ক্ষুদিরাম, রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র প্রমুখ এঁরা ঠিক কারা?
রাজু পারাল: বলতে পারেন, আর কত অপমান সহ্য করবে বাংলা? এই বাংলায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছে। এই বাংলায় ক্ষুদিরামকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের রচনা পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দিয়েছেন একটি রাজ্যের সরকার। অবশেষে নবজাগরণের প্রাণপুরুষ রাজা রামমোহন রায়কে দাগিয়ে দেওয়া হল ‘ব্রিটিশদের দালাল’ রূপে। চমৎকার! একটা রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী খুব সহজেই করে ফেললেন উক্তিটি। স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে, কীভাবে তিনি উচ্চশিক্ষার মন্ত্রী হয়ে উঠলেন। যাঁর প্রাথমিক জ্ঞানটুকু নেই। সন্দেহ থেকে যায় মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর বুদ্ধিবত্তার উপর। নবজাগরণের প্রাণপুরুষ রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, ক্ষুদিরাম, রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র প্রমুখ এঁরা ঠিক কারা?
একজন ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীরা বলে দেবেন ওই সমস্ত যুগপুরুষরা দেশের ও দশের জন্য ঠিক কী কী করেছেন। অথচ উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী হয়ে উনি তা জানেন না। এটা দেশের ও দশের লজ্জা। মনে হয় এঁদের ইতিহাস ওনার বা ওনাদের পাঠ্যসূচির বাইরে ছিল। ইতিহাস যারা পড়েননি ইতিহাসের বুলি তাঁদের মুখে ঠিক মানায় না। ওই রাজ্যের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর কথায়, ‘ব্রিটিশেরা বেশ কয়েকজন ভারতীয়কে ভুয়ো সমাজ সংস্কারক হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন। রাজা রামমোহন রায় ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন, যিনি ব্রিটিশদের দালাল হিসাবে কাজ করতেন।’ হায় রে পোড়া কপাল, ভারতবর্ষ। ক্ষুদিরাম, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের পর এবার অপমানিত হলেন রাজা রামমোহন রায়ও।
এ কেবল আমাদের মনীষীদের আক্রমণ বা অপমান নয়। বাংলা ভাষা, বাংলার ঐতিহ্য, বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার ইতিহাসকে আক্রমণ। নিজের জ্ঞান বাড়াতে শুনে রাখুন মাননীয় মন্ত্রীমশাই ও আপনার দল, রাজা রামমোহন রায় হলেন সেই সিংহপুরুষ যিনি সতীদাহের মতো জঘন্য একটি প্রথাকে রদ (১৮২৯) করেছিলেন দেশ ও দশের জন্য। যা এশিয়া মহাদেশের ইতিহাসে প্রথম আইনিভাবে কোনও সমাজ সংস্কারের ঘটনা। নারী স্বাধীনতা এবং নারীদের অধিকার রক্ষার জন্যও রাজা রামমোহন রায়ের সংগ্রাম ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। সকলের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটাতেও রাজা রামমোহন রায়ের অবদান উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও চিকিৎসা, বিজ্ঞান সহ আধুনিক নানা বিষয়ে পঠন পাঠনের জন্য রাজা রামমোহন রায় যে পরিকল্পনা করেছিলেন ভারতের আধুনিক শিক্ষার নীতি গঠিত হয়েছে তার উপরেই।
ভারতের ‘সাংবাদিকতার জনক’ ও বলা হতো তাঁকে। তবে সতীদাহ প্রথা রদ করতে গিয়ে সেই সময়কার সমাজ এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তার জন্য তিনি অনেক আঘাত সহ্য করেছিলেন। নিজের বউদি অলোকমঞ্জুরী দেবীকে চোখের সামনে সহমরণে যেতে দেখেছিলেন। চোখের সামনে তা দেখা এবং তা দেখে সব কিছু সহ্য করা কতখানি সহ্যক্ষমতা ছিল ওই মহাপুরুষের, তা কি জানা আছে মন্ত্রী মহাশয়ের বা আপনার দলের? রামমোহন রায় যদি সে সময়ে জঘন্য ওই প্রথা বন্ধ না করতেন তা হলে ঘরে ঘরে স্বামীদের সঙ্গে স্ত্রীদের আজও পুড়তে হতো। আপনার বা আমাদের মতো পরিবারও তা থেকে রেহাই পেত না।
উল্লেখ্য, শ্রী চৈতন্য আমাদের দেশে প্রথম সমাজ সংস্কারক হলেও আধুনিক যুগে যদি সমাজ সংস্কারক হিসেবে যদি কারও নাম আসে তা হলে তিনি রাজা রামমোহন রায় ছাড়া কেউ নন। বলা যায়, এই মহামানবই ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে ‘প্রথম আধুনিক মানুষ’ হয়ে উঠেছিলেন। আসলে ভারতবর্ষের শাসক দল (বিজেপি) দেশকে শাসন করতে করতে ভুলে গেছেন ওই সব যুগপুরুষদের। যাঁদের বিন্দু বিন্দু রক্তের মধ্যে দিয়ে দেশের স্বাধীনতা এল। ঠান্ডা ঘরে বসে তাঁদের ‘দালাল’ বলে সহজেই দাগিয়ে দেওয়া যায়। একথা অনস্বীকার্য, ভারতীয় জনতা পার্টি বাংলা বিরোধী মানসিকতার মনোভাব রাখে সবসময়ই যা কোনও ক্ষমাযোগ্য নয়।






