৩৯-এর মেসিকে আটকানোর ছক ফুয়েন্তের! লাপোর্তে-কুবারসিরা কি পারবেন এলএম১০-কে বোতলবন্দি করতে?
বিশেষত বাঙালিদের মধ্যে ফুটবল বিশ্বকাপ বারো মাসে তেরো পার্বণের অন্যতম।
সৌম্য বাগচী: ভারত কোনওদিন বিশ্বকাপে খেলেনি। তবুও বিশ্বকাপ এলেই রাত জাগে ভারত। বিশেষত বাঙালিদের মধ্যে ফুটবল বিশ্বকাপ বারো মাসে তেরো পার্বণের অন্যতম। রবিবারও রাত জাগবে বাংলা। বৃদ্ধা ঠাকুমা থেকে তিন বছরের নাতি। সবাই মিলে উৎসবে মেতে উঠবে। বাড়ির গিন্নিও খেলা দেখবেন। তবে তাঁর এদিন অনেক কাজ। খেলা দেখতে দেখতে চা করতে হবে, এটা ওটা খাওয়ার তুলে দিতে হবে। বাড়ির পুঁচকে সকাল থেকেই হাতে আর্জেন্টিনার ছোট পতাকা আর মেসি লেখা জার্সি পড়ে ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছে। পুঁচকে চেঁচাচ্ছে ‘মেসিন মেসিন’। মেসি তার কাছে মেসিন। আরে স্পেন যতোই শক্তিশালী হোক না কেন, বাংলা তো মেসিকেই ঘরের ছেলে মনে করে। তাই রবিবার সবাই নীল-সাদা আলবিসেলেস্তেদের সাপোর্টার।
তবে এদিক-ওদিক স্পেনের সমর্থকদেরও দেখা যাচ্ছে। মন চাইছে শেষ বিশ্বকাপ খেলতে এসে যেন হাসিমুখে দেশে ফিরতে পারেন মেসি। ঠাকুমা আর পিসি তো সকাল থেকেই হত্যে দিয়ে আর্জেন্টিনার জয়ের কামনায় হত্যে দিয়ে পড়ে রয়েছেন ঠাকুর ঘরে।
না, এতক্ষণ যা কিছু লিখলাম, সব কিছু আবেগের তাড়নায়। বাস্তব কিন্তু অশনি সঙ্কেত দিচ্ছে। স্প্যানিশ আর্মাডা এবারের বিশ্বকাপে এসেছে তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে। তাদের সাফল্য কোনও চমক নয়, দলগত ফুটবলের অপূর্ব নিদর্শন। পাসা আর পাস- বিপক্ষ থমকে যাচ্ছে আক্রমণ শানাতে। স্পেনের বিরুদ্ধে এবার কোনও দলেরই প্ল্যান এ, প্ল্যান বি কিছুই খাটেনি। দুরন্ত খেলে সেমিফাইনালে ওঠা ফ্রান্সকে যেভাবে স্পেন ২-০ গোলে হারাল, তার কোনও জবাব হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিততে ফুয়েন্তের ছেলেরা বদ্ধপরিকর।
এবার বাস্তবের মাটিতে নেমে দুই দলের শক্তি, দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
একদিকে বলের নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত আক্রমণে ওঠার ক্ষমতা আর তরুণ প্রতিভার ঝলক, অন্যদিকে অভিজ্ঞতা, কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য আর লিওনেল মেসির অমলিন জাদু। স্পেন ও আর্জেন্টিনার এই লড়াই আসলে দুই ভিন্ন ফুটবল ভাবনার সংঘর্ষ।
স্পেনের শক্তি তাদের গুছিয়ে খেলা। মাঠের প্রতিটি অংশে খেলোয়াড়দের বোঝাপড়া, দ্রুত পাস এবং বল নিজেদের দখলে রাখার দক্ষতা তাদের বড় অস্ত্র। দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণের গতি বাড়িয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ তৈরি করাই তাদের অন্যতম কৌশল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা জানে কীভাবে বড় মঞ্চে নিজেদের সেরাটা বের করে আনতে হয়। কঠিন মুহূর্তে একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত দক্ষতাও বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের ছবি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, মেসিকে কীভাবে আটকাবে স্পেন? ৩৯ বছরে পা দিলেও আর্জেন্টিনার অধিনায়কের জাদু এখনও অটুট। আট গোল ও চারটি সহায়তা নিয়ে তিনি সেরা গোলদাতার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ২১ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার জায়গাও এখন তাঁর দখলে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে তাঁর দু’টি অসাধারণ সহায়তাই আর্জেন্টিনাকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখিয়েছিল।
স্পেনের রক্ষণভাগের বড় দায়িত্ব থাকবে মেসির জায়গা ছোট করে দেওয়া। অভিজ্ঞ এমেরিক লাপোর্তের নেতৃত্বে রদ্রি ও তরুণ পাউ কুবারসিকে মিলেই সামলাতে হবে এই চ্যালেঞ্জ। সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করা স্পেনের রক্ষণ এখনও পর্যন্ত দুর্দান্ত। লাপোর্তের স্থিরতা ও নেতৃত্ব এই সাফল্যের অন্যতম কারণ।
মাঝমাঠেও হতে চলেছে তীব্র লড়াই। স্পেনের রদ্রি ও আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজের দ্বৈরথ অনেকটাই ঠিক করে দিতে পারে ম্যাচের গতিপথ। রদ্রি বল নিয়ন্ত্রণ, খেলার ছন্দ তৈরি এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙার ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। পুরো প্রতিযোগিতায় তাঁর পরিশ্রমও নজর কেড়েছে।
অন্যদিকে এনজো আর্জেন্টিনার প্রাণশক্তি। কাতার বিশ্বকাপের সেরা তরুণ খেলোয়াড় এবারও বড় মুহূর্তে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। শেষ ষোলোতে মিশরের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ে এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে তিনি দলের ভরসা হয়ে উঠেছেন।
স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালও হতে পারেন ম্যাচের অন্যতম আকর্ষণ। চোট কাটিয়ে ফিরে তিনি ধীরে ধীরে নিজের ছন্দে ফিরেছেন। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে তাঁর গতি ও বুদ্ধিদীপ্ত খেলা থেকেই স্পেন গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছিল। ফাইনালে তাঁকে আটকানোর দায়িত্ব থাকবে অভিজ্ঞ নিকোলাস তালিয়াফিকোর ওপর।
ইয়ামালের গতি, সৃজনশীলতা ও আক্রমণাত্মক মানসিকতার বিরুদ্ধে তালিয়াফিকোর অভিজ্ঞতা ও রক্ষণাত্মক দক্ষতার লড়াইও হবে দেখার মতো। কখন আক্রমণ থামাতে হবে, কখন জায়গা বন্ধ করতে হবে— এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে অনেক কিছু।
শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ট্রফি নির্ধারণ হতে পারে একটি ছোট মুহূর্তে। একটি ভুল, একটি অসাধারণ পাস বা একটি জাদুকরী গোল বদলে দিতে পারে ইতিহাস। নিউ জার্সির সেই মহামঞ্চে তাই শুধু দুই দল নয়, মুখোমুখি হবে দুই ফুটবল দর্শন, দুই প্রজন্ম এবং কোটি কোটি সমর্থকের স্বপ্ন।






