কলকাতা

আইইএম–ইউইএম এর উদ্যোগে উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ ভাবনার অভিনব প্রদর্শন

বছরের পর বছর ধরে ‘ইনোভাসিয়ন’ পড়ুয়াদের উৎসবের সীমা পেরিয়ে এখন উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা মনোভাব এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমস্যা সমাধানের এক আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

Truth Of Bengal: রাহুল চট্টোপাধ্যায়: ‘ইনোভাসিয়ন ২০২৬’— শীর্ষক
অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ ভাবনার শক্তিশালী প্রদর্শন অনুষ্ঠিত হলো
আইইএম–ইউইএম কলকাতায় । কলকাতার ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (আইইএম) এবং ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (ইউইএম) যৌথভাবে তাদের ফ্ল্যাগশিপ আন্তর্জাতিক টেকনো–ম্যানেজমেন্ট উৎসব ‘ইনোভাসিয়ন ২০২৬’-এর ১২তম সংস্করণের সূচনা করল সল্টলেকের সেক্টর ফাইভ- এ অবস্থিত আইইএম ম্যানেজমেন্ট হাউসে।দুই দিনব্যাপী ওই উৎসবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা-সহ একাধিক দেশের ছাত্রছাত্রী, গবেষক, উদ্ভাবক, স্টার্টআপ উৎসাহী, উদ্যোক্তারা অংশ নেন। আইআইটি ও এনআইটি-সহ দেশের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

বছরের পর বছর ধরে ‘ইনোভাসিয়ন’ পড়ুয়াদের উৎসবের সীমা পেরিয়ে এখন উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা মনোভাব এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমস্যা সমাধানের এক আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে। আইইএম–ইউইএম গোষ্ঠীর গড়ে তোলা স্টার্টআপমুখী শিক্ষাব্যবস্থারই প্রতিফলন এই উৎসব। এবারের আয়োজনে রয়েছে ৩৫টিরও বেশি প্রতিযোগিতা, ১৫০টি-রও বেশি প্রযুক্তি প্রকল্প এবং ১০০টিরও বেশি গবেষণা পোস্টার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, এমবেডেড সিস্টেম, ডেটা সায়েন্স, নবায়নযোগ্য শক্তি, টেকসই প্রযুক্তি এবং ম্যানেজমেন্ট উদ্ভাবন—এই সব আধুনিক ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে প্রকল্পগুলি উপস্থাপিত হয়েছে।

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ৩৬ ঘণ্টার হ্যাকাথন, যেখানে দলগুলি নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে বাস্তব সমস্যার সমাধানমুখী প্রযুক্তি প্রোটোটাইপ তৈরি করে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আইইএম–ইউইএমের মূল দর্শন—‘উদ্ভাবনকে তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব প্রয়োগে রূপ দেওয়া’- যথার্থভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

এবারের উৎসবের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন একটি স্বয়ংচালিত লেভেল–২ ড্রাইভারলেস গাড়ি, যা সম্পূর্ণভাবে আইইএম-এর ছাত্রছাত্রীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কম্পিউটার ভিশনের সাহায্যে তৈরি করেছে। বহুবিভাগীয় ছাত্রদলের যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি এই প্রকল্প বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্বনির্ভর স্বয়ংচালিত প্রযুক্তি গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি নির্দেশ করছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন সমুদ্রের জলকে পানযোগ্য জলে রূপান্তর করতে সক্ষম ‘ওয়াটার ডেসালিনেটর সিস্টেম’। স্বল্প খরচে এবং বড় পরিসরে ব্যবহারযোগ্য এই প্রযুক্তি উপকূলীয় অঞ্চল এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় জলের সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়াও প্রদর্শিত হয়েছে স্বল্পমূল্যের বৈদ্যুতিক হুইলচেয়ার, যা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচল সহজ করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি। সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী এই প্রযুক্তি সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে।
উৎসবে প্রদর্শিত আরও বেশ কয়েকটি উদ্ভাবন দর্শকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। তার মধ্যে রয়েছে ‘থার্মা কমপ্রেস বেল্ট’, যা তাপ এবং চাপের সমন্বয়ে কোমরের ব্যথা ও ঋতুকালীন যন্ত্রণায় উপশম দিতে সক্ষম একটি পরিধানযোগ্য চিকিৎসা সহায়ক যন্ত্র।

একটি থ্রিডি-প্রিন্টেড এআর/ভিআর জাইরোস্কোপিক গেম কন্ট্রোলার সম্পূর্ণ শরীরের নড়াচড়ার মাধ্যমে গেম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়, যা ডিজিটাল বিনোদনের সঙ্গে শারীরিক সক্রিয়তার মেলবন্ধন ঘটায়।
নিরাপত্তা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ‘সিকিউরা’ নামের একটি ওয়েব-ভিত্তিক ডিপ লার্নিং নজরদারি প্ল্যাটফর্ম প্রদর্শিত হয়েছে, যা ৬৪ পয়েন্টের মুখাবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে তৈরি।

রোবোটিক্স ক্ষেত্রেও একাধিক প্রকল্প নজর কাড়ে। থার্মাল সেন্সর ও জিপিএস যুক্ত একটি স্বয়ংক্রিয় দুর্যোগ উদ্ধার রোবট ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা জীবিত ব্যক্তিদের সনাক্ত করতে সক্ষম। অন্যদিকে ‘অগ্নি’ নামে একটি মডুলার মানববিহীন ড্রোন, দ্বৈত পেলোড ব্যবস্থাসহ, জরুরি ওষুধ সরবরাহ এবং আকাশপথে নজরদারির জন্য তৈরি করা হয়েছে।হাতের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত একটি রোবট মানব–যন্ত্র পারস্পরিক যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা তুলে ধরেছে।
এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি গৌরবের মুহূর্ত। সম্প্রতি ইউইএম কলকাতার ছাত্রছাত্রীরা দিল্লির ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬’-এর ‘ইউভএআই গ্লোবাল ইয়ুথ চ্যালেঞ্জ’-এ প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে।

২০ হাজারেরও বেশি প্রকল্পের মধ্যে প্রথম পুরস্কার পাওয়া ‘অগ্নিসেনা’—একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বন অগ্নিকাণ্ড পূর্বাভাস ব্যবস্থা—১৫ লক্ষ টাকা পুরস্কার পেয়েছে। দ্বিতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘ভক্স-এইড’, যা ডিসআর্থ্রিয়া রোগের প্রাথমিক সনাক্তকরণের জন্য একটি ভয়েস-ভিত্তিক প্রযুক্তি, পেয়েছে ১০ লক্ষ টাকা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত শিল্পী পণ্ডিত তরুণ ভট্টাচার্য, ইসরোর স্পেস অ্যাপ্লিকেশনস সেন্টার (এসএসি), আহমেদাবাদের বিজ্ঞানী ড. মৌমিতা দত্ত , ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস-এর ডিজিটাল স্ট্যান্ডার্ডস কো-অর্ডিনেশন কমিটির চেয়ারম্যান অনুপম আগরওয়াল।

ওই অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে ইউইএম কলকাতার উপাচার্য অধ্যাপক (ড.) সত্যজিৎ চক্রবর্তী বলেন,
ইনোভাসিয়ন ২০২৬ আমাদের ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকদের নিরন্তর সৃজনশীল প্রচেষ্টার উদ্‌যাপন। ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিটে জাতীয় স্তরে সাফল্য, আইইএম-এ তৈরি ড্রাইভারলেস গাড়ি এবং শতাধিক উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রমাণ করে যে আইইএম–ইউইএম পরিবেশে উদ্ভাবন স্বাভাবিকভাবেই উদ্যোক্তা ভাবনায় রূপ নেয়।’
ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত আইকিউএসি, আইইএম–ইউইএম গ্রুপের ডিরেক্টর অধ্যাপক ড. রাজশ্রী পাল বলেন, ড্রাইভারলেস যানবাহন থেকে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্য প্রযুক্তি—এই বহুমুখী উদ্ভাবনই দেখায় যে তরুণদের এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে স্টার্টআপ ও শিল্পে পরিণত হতে পারে।

উৎসবের আহ্বায়ক ও আইইএম-এর বেসিক সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড.প্রবীর কুমার দাস বলেন, এই উৎসব এখন এমন একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে যেখানে প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা এবং উদ্যোক্তা ভাবনা একত্রিত হয়ে বাস্তব উদ্ভাবনে রূপ নেয়।

প্রযুক্তি প্রদর্শনী ও গবেষণা প্রদর্শনের পাশাপাশি এই উৎসবে রয়েছে রোবোটিক্স প্রতিযোগিতা, কোডিং চ্যালেঞ্জ, ম্যানেজমেন্ট প্রতিযোগিতা, ই–স্পোর্টস টুর্নামেন্ট এবং সৃজনশীল উদ্ভাবনী প্রদর্শনী—যেখানে প্রকৌশল, ব্যবসায়িক কৌশল এবং স্টার্টআপ ভাবনার সমন্বয় ঘটেছে।

‘ইনোভাসিয়ন ২০২৬’ যৌথভাবে আয়োজন করেছে রোটারি ক্লাব অব সল্টলেক সিলিকন ভ্যালি এবং আইইএম লায়ন্স ক্লাব, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পক্ষেত্র এবং সামাজিক সংগঠনের পারস্পরিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
উদ্ভাবন, গবেষণা, উদ্যোক্তা মনোভাব এবং আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের এই সমন্বয়ে ‘ইনোভাসিয়ন ২০২৬’ আইইএম–ইউইএম গোষ্ঠীর প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব এবং স্টার্টআপমুখী শিক্ষার শক্তিশালী প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।

Related Articles