তারেক-জমানায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক
গত ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এর সাধারণ নির্বাচনে বিপুল জনমত নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
সত্যগোপাল দে: এটা বললে মিথ্যা ভাষণ হবে না যে, বিগত প্রায় আঠারো মাস ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। বাংলাদেশের মাটিতে খুল্লামখুল্লা দেখা গিয়েছিল ভারত বিদ্বেষ। প্রধান উপদেষ্টা ইউনুস ভারতের বিরুদ্ধে বিষদোগার করে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের দিকে। ২০২৪-এর উত্তাল ছাত্র আন্দোলন আর শেখ হাসিনার প্রস্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক বাতাবরণ শুরু হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এর সাধারণ নির্বাচনে বিপুল জনমত নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন ও রাজনৈতিক লড়াই কাটিয়ে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। ঢাকার রাজপথে এখন পরিবর্তনের স্লোগান, কিন্তু দিল্লির সাউথ ব্লকে প্রশ্নটা অন্য— ‘হাসিনা-পরবর্তী’ এই বাংলাদেশে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণটা ঠিক কেমন হবে? এই সম্পর্কের শিকড় যেমন ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে প্রোথিত, তেমনই এর ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে আছে ২০২৬-এর জটিল ভূ-রাজনীতির ওপর।
১৯৭১— এক অবিচ্ছেদ্য নাড়ির টান
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের আলোচনা শুরু করতে গেলে প্রথমেই ফিরে তাকাতে হয় ১৯৭১ সালে। সেটি ছিল কেবল দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা নয়, বরং এক মানবিক ও আত্মিক বন্ধনের ইতিহাস। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত যেভাবে এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল এবং মুক্তিবাহিনীর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসের এক বিরল দৃষ্টান্ত। জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাক জেনারেল নিয়াজির সেই ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের দৃশ্য আজও দুই দেশের যৌথ স্মৃতির অংশ।
ভারত মনে করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ভারতীয় জওয়ানদের রক্ত বিফলে যেতে পারে না। কিন্তু গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের একাংশের মধ্যে এক ধরনের ‘ভারত-বিরোধী’ মনোভাব দানা বেঁধেছে। তারেক রহমান সরকারে আসার পর দিল্লির প্রত্যাশা— ১৯৭১-এর সেই যৌথ ত্যাগের মহিমা যেন বর্তমানের রাজনৈতিক সমীকরণে হারিয়ে না যায়। তবে তারেক রহমান নিজেও জানেন, কেবল আবেগ দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি চলে না, সেখানে প্রয়োজন স্বার্থের সঠিক সমন্বয়।
২০২৪–এর ‘জুলাই বিপ্লব‘ ও জনগণের ম্যান্ডেট
এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল ২০২৪-এর ২৪ জুলাইয়ের সেই অভূতপূর্ব ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। সাধারণ মানুষ এবং ছাত্র সমাজ যেভাবে তৎকালীন ‘প্রতিনিধিত্বশীল’ সরকারকে বয়কট করেছিল, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড়। কোটা আন্দোলন থেকে শুরু করে একদফা দাবিতে রাজপথের সেই লড়াই প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিনের একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় ক্লান্ত ছিল।
তারেক রহমান অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সেই জনরোষের নাড়ি বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্য কেবল অভ্যন্তরীণ সমর্থন নয়, বরং ভারতের মতো বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে এক ধরনের ‘কাজের সম্পর্ক’ বজায় রাখা অপরিহার্য। তাই ২০২৬-এর নির্বাচনে জয়ের পর থেকেই তিনি এক অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও পরিণত রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় দিচ্ছেন। আশাকরি, এটা তিনি বজায় রাখতে পারবেন।
তারেকের চতুর ভারসাম্য— জামাতের সঙ্গে দূরত্ব
এবারের নির্বাচনে তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ‘মাস্টারস্ট্রোক’ ছিল জামাতে-ই-ইসলামির সঙ্গে কোনও আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী জোট না করা। অতীতে বিএনপি-জামাত জোটের সময় ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল, তারেক রহমান এবার তা শুরুতেই প্রশমিত করতে চেয়েছেন। তিনি কৌশলে জামাতকে নির্বাচনী ময়দানে একা ছেড়ে দিয়েছেন, যাতে আন্তর্জাতিক মহলে এবং বিশেষ করে ভারতের কাছে নিজেকে একজন ‘উদারবাদী’ ও ‘গণতান্ত্রিক’ নেতা হিসেবে তুলে ধরা যায়।
তাঁর এই পদক্ষেপ দিল্লিকে একটি বার্তা দিয়েছে। বিএনপি এখন আর কোনও কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল নয়। তিনি ভারতের সঙ্গে এক ধরনের ‘পজেটিভ এনগেজমেন্ট’ বা ইতিবাচক সম্পৃক্ততার পথ খুঁজছেন। তিনি জানেন, দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং চিনের ঋণের জাল এড়াতে ভারতের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সীমান্তের চোরাস্রোত— জামাতের নীরব উত্থান
তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জামাতকে ত্যাগ করলেও, নির্বাচনের ফলাফল এক ভিন্ন ও কিছুটা উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও, ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে— যেমন সাতক্ষীরা, যশোর, দিনাজপুর এবং উত্তরবঙ্গের সীমান্ত এলাকায়— জামাত সমর্থিত প্রার্থীরা প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের জন্য এটি একটি বড় চিন্তার বিষয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে সরব। যদি বাংলাদেশের সীমান্ত জেলাগুলোতে জামাতের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ মজবুত হয়, তবে বিএসএফ এবং সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর কাজ অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে। তারেক রহমান কেন্দ্রীয়ভাবে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাইলেও, স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর দলের ক্যাডার এবং জামাতের মধ্যে যদি সংঘাত বা গোপন আঁতাত থাকে, তবে তার প্রভাব সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের ওপর পড়বে।
ঝুলে থাকা সমস্যা— হাসিনা, জল ও ট্রানজিট
সম্পর্কের এই নতুন পালায় প্রধান তিনটি কাঁটা হল— শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি এবং ট্রানজিট সুবিধা। হাসিনা ফ্যাক্টর— ২৪ জুলাইয়ের ঘটনার পর শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ঢাকার নতুন সরকারের জন্য একটি বড় আবেগের বিষয়। সাধারণ মানুষের দাবি তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করা। দিল্লি যদি তাঁকে প্রত্যর্পণ না করে, তবে ঢাকার রাস্তায় ভারত-বিরোধী ক্ষোভ ফের মাথাচাড়া দিতে পারে। গঙ্গা চুক্তি (২০২৬)— ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এই বছরের শেষেই। তারেক সরকার সম্ভবত এই চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি ভাগ দাবি করবে। তিস্তা চুক্তির জট এখনও খোলেনি, তার ওপর গঙ্গার জল নিয়ে নতুন করে চাপ তৈরি হলে দিল্লির জন্য তা সামলানো কঠিন হবে। কানেক্টিভিটি— ভারত যে ট্রানজিট সুবিধা ভোগ করছে, তা তারেক রহমান সরকার অব্যাহত রাখবে কি না, তা নিয়েও জল্পনা রয়েছে। যদিও অর্থনৈতিক লাভের কথা চিন্তা করে বিএনপি হয়তো এটি বন্ধ করবে না, তবে তাঁরা শুল্ক বা ফি বৃদ্ধির দাবি তুলতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকা
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের চাবিকাঠি অনেকটা কলকাতার নবান্নেও থাকে। তিস্তা থেকে গঙ্গা— যে কোনও চুক্তিতে পশ্চিমবঙ্গের সম্মতি ছাড়া দিল্লি একচুলও নড়তে পারবে না। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্রুত অভিনন্দন বার্তা এবং তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানোর মধ্য দিয়ে দিল্লি এক ধরনের ‘রিয়েল পলিটিক্স’ বা বাস্তবধর্মী রাজনীতির ইঙ্গিত দিয়েছে।
তারেক রহমান সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন যে, ‘ভারত-বিরোধিতা’ হয়তো ভোট এনে দিতে পারে, কিন্তু দেশ চালানো এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই। তবে তাঁর এই ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ কতদিন সফল হবে, তা নির্ভর করছে তিনি কীভাবে নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ কট্টরপন্থী শক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন তার ওপর। ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ যে বন্ধুত্বের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬-এ এসে তা এক নতুন মোড় নিল— যেখানে আবেগ কম, কিন্তু বাস্তবের টানাপোড়েন অনেক বেশি।






