রাজ্যের খবর

‘তাজা নেতা’ থেকে আইএসএফের মুখ, ক্যানিং পূর্বে শক্তি দেখিয়ে মনোনয়ন জমা আরাবুলের

একসময় যিনি তৃণমূলের ‘নয়নের মণি’ ছিলেন, আজ তিনি সেই দলের কাছেই অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছেন, এমনটাই রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত।

গোপাল শীল, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: একসময় ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেসের দাপুটে বিধায়ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন আরাবুল ইসলাম। রাজনীতির ময়দানে তাঁর উত্থান ছিল দ্রুত, এবং একসময় তিনি শাসক দলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত ছিলেন। এমনকি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ‘তাজা নেতা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ও সমীকরণ বদলাতে শুরু করে, আর সেই পরিবর্তনের ফলেই আজ আরাবুল ইসলামের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন।

দীর্ঘদিন তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর সম্প্রতি দল ছেড়ে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)-এ যোগ দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্র থেকে আইএসএফ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন আরাবুল ইসলাম। একসময় যিনি তৃণমূলের ‘নয়নের মণি’ ছিলেন, আজ তিনি সেই দলের কাছেই অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছেন, এমনটাই রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত।

বুধবার মনোনয়ন জমা দেওয়ার দিন ক্যানিংয়ে নিজের শক্তি প্রদর্শনে কোনও রকম ঘাটতি রাখেননি আরাবুল ইসলাম। কয়েক হাজার কর্মী-সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে তিনি একটি বিশাল মিছিল করে ক্যানিং মহকুমা শাসকের দফতরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে পথে তাঁর সমর্থনে স্লোগান ওঠে, আইএসএফের পতাকায় ছেয়ে যায় এলাকা। এই মিছিল ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও উৎসাহ চোখে পড়ার মতো ছিল।

মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের সামনে আরাবুল ইসলাম শাসক দলের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা এলাকায় গণতন্ত্রকে কার্যত ‘হত্যা’ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমন করা হচ্ছে, এমনই অভিযোগ তাঁর। তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতির পরিবর্তন দরকার, আর সেই পরিবর্তনের জন্যই মানুষ এবার আইএসএফকে ভোট দেবে।”

আরাবুল ইসলাম আরও জানান, তিনি যখন বিভিন্ন এলাকায় প্রচারে যাচ্ছেন, তখন সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর পাশে দাঁড়াচ্ছেন। মানুষের এই সাড়া তাঁকে আশাবাদী করে তুলেছে। তাঁর কথায়, “আমি ক্যানিং পূর্বের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। উন্নয়ন ও মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করব। মানুষ পরিবর্তন চাইছে, আর সেই পরিবর্তনের প্রতীক হবে আইএসএফ।”

তবে মনোনয়ন জমার দিন বিতর্কও পিছু ছাড়েনি। আরাবুল ইসলামের অভিযোগ, তাঁর মিছিলকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বহু জায়গায় তাঁর কর্মী-সমর্থকদের গাড়ি আটকে দেওয়া হয়েছে এবং ভয় দেখানোর চেষ্টা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। যদিও এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে শাসক দল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্র এবারের নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। এখানে তৃণমূল কংগ্রেস, আইএসএফ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই দিক থেকে আরাবুল ইসলামের প্রার্থিতা এই কেন্দ্রের নির্বাচনী সমীকরণকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। একসময়ের তৃণমূলের বিশ্বস্ত সৈনিক আজ বিরোধী শিবিরের অন্যতম মুখ। তাঁর এই রাজনৈতিক পালাবদল ক্যানিং পূর্বের ভোটের লড়াইয়ে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখন জোর আলোচনা চলছে। তবে আরাবুল ইসলাম আত্মবিশ্বাসী, তিনি মনে করছেন, মানুষের সমর্থনই শেষ পর্যন্ত তাঁর জয়ের পথ সুগম করবে।

সব মিলিয়ে, ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রে এবারের নির্বাচন যে জমজমাট হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন একসময়ের ‘তাজা নেতা’ আরাবুল ইসলাম, যিনি এখন নতুন দল, নতুন প্রতীক এবং নতুন বার্তা নিয়ে ভোটের ময়দানে নিজের প্রভাব প্রমাণ করতে প্রস্তুত।

Related Articles