সম্পাদকীয়

পরিষেবা দিতে গিয়ে সময়ের সঙ্গে যুদ্ধে অসহায় ‘গিগ’ কর্মীরা

অতি কম সময়ের মধ্যে গ্রাহকের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দ্রুত পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন

সুদীপ্ত দে: বর্তমানে যেভাবে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা উন্নতি হয়েছে, তাতে সহজেই জনসাধারণ ঘরে বসে সমস্ত পরিষেবা সহজেই পেয়ে যাচ্ছে। এই সমস্ত পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলি সমাজের বিভিন্ন জায়গায় তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ জোম্যাটো, সুইগি, জেপ্টো-সহ অন্যান্য পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা। এই সংস্থাগুলি সাধারণ বেকার যুবকদের নিয়োগ করে রুটি-রোজগারের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহারকারী জিনিস, খাদ্যদ্রব্য অতি কম সময়ের মধ্যে গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এই পৌঁছে দেওয়াকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে ডেলিভারি কর্মীদের। তারা অতি কম সময়ের মধ্যে গ্রাহকের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দ্রুত পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ঘটছে দুর্ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রেই জীবনহানিও ঘটছে।

এই সমস্ত ডেলিভারি কর্মীরা পরিষেবা প্রদান করার জন্য সাইকেল অথবা বাইকের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে যাচ্ছেন। কম সময়ে যত বেশি পরিষেবা দেওয়া যাবে ততই আয় বেশি হবে। ফলে একটা প্রতিযোগিতা থাকে সবার মধ্যে। আবার অনেক অ্যাপ নির্দিষ্ট সময়ে মধ্যে গ্রাহকদের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তাই সময় একটা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ডেলিভারি কর্মীদের কাছে। সময়ের সঙ্গে ‘যুদ্ধ’ করার মানসিকতা নিয়ে এই পেশায় আসছেন কর্মীরা। আর পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে পথে নানান ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাঁদের। প্রতিনিয়ত ছোট থেকে বড় দুর্ঘটনা যেমন ঘটছে তাতে ডেলিভারি কর্মীদের অনেকের জীবনহানিও ঘটছে। আর এই সমস্ত কোম্পানিগুলি ডেলিভারি কর্মীদের জন্য কোনও জীবনবিমা ও স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা দেয় না। অথচ এই কোম্পানিগুলি বিপুল অরথ মুনাফা করছে। আর সেই মুনাফা তারা নিয়ে চলে যাচ্ছে ভিনরাজ্যে। অথচ রাজ্যের যে সব যুবক এই পেশায় যুক্ত থেকে তাদের মুনাফার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন, তারা উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছেন।

আকস্মিকভাবে মৃত্যু হলে সেই ডেলিভারি কর্মীর পরিবার অথৈ জলে পড়ে যাচ্ছে। সেই পরিবার কোনওরকমের আর্থিক সাহায্য যেমন পাবে না তেমনই অন্য কোনও সুযোগ সুবিধা ও পাবে না। তাই এই ডেলিভারি কর্মীদের ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকারে। অল্প আয়ের ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি ডেলিভারি বয়রা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিষেবা দিচ্ছেন। ভারতে বেশিরভাগ ডেলিভারি কর্মীর বার্ষিক আয় ২.৫ লক্ষ টাকার কম, অর্থাৎ দৈনিক ৭০০ টাকার নিচে, এবং অধিকাংশেরই কোনও জীবনবিমা নেই। অনেক ছোট বা মাঝারি প্ল্যাটফর্মে কর্মীদের জন্য কোনও গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স থাকে না। বড় কোম্পানিগুলো বিমার কথা বললেও, তার দাবি পাওয়ার প্রক্রিয়া এতই জটিল যে সাধারণ পরিবারগুলি তা বুঝে উঠতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ডেলিভারি কর্মীদের একটি বড় অংশ ঋণের জালে জর্জরিত এবং তাদের কোনও ব্যক্তিগত জীবন বিমা নেই। সরকারি স্তরে ‘গিগ কর্মীদের’ জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জোরালো হচ্ছে, যাতে অন্তত দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুতে পরিবারগুলো নিঃস্ব না হয়ে যায়। আমাদের ১০ মিনিটে ডেলিভারি দেওয়ার তাগিদ যেন কোনও পরিবারের সারাজীবনের কান্নার কারণ না হয়। কোম্পানিগুলোর উচিত কেবল মুনাফার দিকে না তাকিয়ে এই ‘অদৃশ্য’ যোদ্ধাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নচেৎ, এই আধুনিক পরিষেবা ব্যবস্থার ভিত অত্যন্ত নড়বড়ে থেকে যাবে।

Related Articles